বাংলার রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশে হিসেবে পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক হিংসা কিন্তু কেন?
নন্দ দুলাল ভট্টাচার্য, হাকিকত নিউজ, গ্রাম বাংলা : বিশ্বের অনেক দেশে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক হিংসা একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা গিয়েছে।ভারতের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশে, রাজনৈতিক হিংসা সাধারণত নির্বাচনী রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হিংসার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যা কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত এবং যা রাজ্যের রাজনীতিতে একটি জটিল এবং গভীর প্রভাব ফেলেছে। দেশে স্বাধীনতার পর থেকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই রাজ্যে তাদের সরকার গঠন করেছে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (INC) দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থেকেছে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) এর নেতৃত্বে বামপন্থীরা প্রায় তিন দশক ধরে ক্ষমতায় ছিলো এখন বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) প্রায় ১১ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। বেশিরভাগ সাধারণ গ্রামবাংলার মানুষ কিন্তু এই রাজনৈতিক হিংসা কে কোনো ভাবেই সমর্থন করেননা। যারা আক্রমণ করছেন বা যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তারা কিন্তু কেউ মঙ্গল গ্রহ থেকে আসছেন না সবাই কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষ। প্রশ্ন তো এটাই যে তাহলে গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো নির্বাচনে এতো হিংসা কেন ? এই রাজনৈতিক হিংসার পেছনের যৌক্তিকতা ও মূল কারণ তাহলে কী?
রাজনৈতিক হিংসার প্রেক্ষাপট
যদি আমরা এই রাজনৈতিক হিংসার কারণ গুলিকে আরও বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করি তার বহুমাত্রিক কারণ রয়েছে কিন্তু একটা মূল কারণ হলো বেকারত্ব। সবুজ, লাল, নীল , হলুদ , গেরুয়া সব রঙের দলগুলি নিজেদের শাসনকালে প্রায়শই বেকার যুবকদের ব্যবহার করে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদের আক্রমণ এবং ভয় দেখানোর জন্য।আধিপত্যের লড়াই এবং নির্বাচনী সাফল্য চরিতার্থে পঞ্চায়েতগুলি ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে ৷ “১৯৭৮ সালে যখন থেকে পশ্চিমবঙ্গে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তখন থেকেই বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের অর্থ আসতে শুরু করে। একেকটা প্রকল্পের জন্য কয়েকশো কোটি টাকাও আসে, এবং প্রকল্পের সংখ্যাও অনেক। বরাদ্দকৃত এই বিপুল অর্থে যে দুর্নীতি হচ্ছে, সেটা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন হিসাব কষে দেখিয়েছিলেন রাজীব গান্ধী। তিনি বলেছিলেন যে সরকার কর্তৃক ব্যয় করা প্রতিটি টাকার মধ্যে মাত্র ১৫ পয়সাই উদ্দিষ্ট সুবিধাভোগীর কাছে পৌছাচ্ছে । বিপুল অর্থের হাতছানি, তাই ভোটে জিততে মরিয়া সব রাজনৈতিক দল। “এইসব উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থের ভাগ পাওয়ার লোভেই পঞ্চায়েত ভোটে জিততে মরিয়া হয়ে ওঠেন প্রার্থীরা, সেজন্যই এত হিংসা হয় এই নির্বাচনে। রাজনৈতিক ক্ষমতার উপর পূর্ন আধিপত্যের লড়াইয়ে রাজনৈতিক দলগুলি হিংসার অবলম্বন করতে দ্বিধা করেননা। “পঞ্চায়েতের দুর্নীতিতে প্রতিটা রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরাই জড়িত আছেন, কেউ কম কেউ বেশি “। পঞ্চায়েতকে ঘিরে দুর্নীতি আজকের নয় বিগত কয়েক দশক ধরে এটা একটা প্রতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে ফেলেছে।
সরকারী সুযোগ সুবিধে নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি
দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে পশ্চিম বঙ্গে একটা ধারাবাহিকতা চলে এসেছে যে ক্ষমতাসীন দলথেকে সমর্থনকারী পরিবারগুলি সরকারী সহায়তা কর্মসূচি থেকে সর্বাধিক সুবিধা পেয়ে থাকে। গ্রামীণ এলাকায় নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো তাদের বেঁচে থাকা ও জীবিকা নির্বাহের জন্য এসব কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল এবং তাদের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তার জন্য এই কর্মসূচিতে প্রবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ । গ্রাম পর্যায়ে ক্ষমতাসীন পার্টি কর্মীদের এই সম্পদগুলির উপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব-কবলিত এলাকায় এই সম্পদগুলি নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দ্বন্দ্বের কারণে হিংসা নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত ছিল। দীর্ঘ সময় থেকে শাসক গোষ্ঠীর থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে এবং বর্তমান সরকার ঠিক একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছে। দলগুলোর ব্যাপক উপস্থিতি, বিশেষ করে গ্রামবাংলার নিম্নবিত্ত সমাজে রাজনৈতিক আধিপত্যের বিষয়টিকে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যই নয়, তাদের সমর্থকদের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেখানে তাদের সরকারী সুযোগ সুবিধা,কর্মসংস্থানে রাজনৈতিক দলের উথান পতনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। সরকারি সুবিধা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ হারানোর সাথে জড়িত নিরাপত্তাহীনতা নির্বাচনের সময় ব্যাপক হারে হিংসার দিকে পরিচালিত করে। এটা তো সর্বজনবিদিত যে শাসক গোষ্ঠীর সাথে থাকলে বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায় তাই বিগত সাত দশক ধরে রাজনীতি টাই বেকার যুবকদের জন্য কর্মসস্থান এর অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিংসার উৎস রাজনৈতিক মতাদর্শ নয় নিছক বেঁচে থাকার তাকিদে আর কর্মসংস্থান হারানোর ভয়। রাজনৈতিক হিংসা ঐতিহাসিকভাবে বাংলার রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি । বছরের পর বছর ধরে, বেকার যুবক এবং যুবতীরা , বিশেষ করে শহুরে এবং গ্রামীণ এলাকায়, বিশ্বাস করেছে যে স্থিতিশীল আয় নিশ্চিত করার সর্বোত্তম উপায় হল শাসক দলের সাথে সারিবদ্ধ হওয়া। এইভাবে, জীবিকার জন্য রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলির উপর বেকার যুবসমাজের নির্ভরতা ক্রমশ বেড়েছে। এই অতিনির্ভরতা রাজনৈতিক হিংসা কে উসকে দেয়।কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের দ্বারা টিভি বিতর্কে অন্যায়কে ন্যায়সঙ্গত করার চেষ্টা করা কোনও সমাধান নয়। যতদিন কর্মসংস্থান বিমুখ বঙ্গে ,রাজনীতি টাই বেকার যুবক দের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে থেকে যাবে রাজনৈতিক হিংসা রোধ করা বোধহয় কোনো দিনও সম্ভব নয়। মিডিয়া হাউসের ডিবেট কথার মারপেঁচে আর জ্ঞান গর্ভ বাণী নয় বেকারত্ব মোকাবেলায় রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি উদ্দেশ্যমূলক এবং পরিষ্কার রোড ম্যাপ তৈরি করতে হবে।
সংবিধিবদ্ধ ঘোষণা : একটি নিরপেক্ষ নিউজ পোর্টাল হিসেবে উপলব্ধ তথ্য ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই সংবাদে বক্তব্য ও মন্তব্য দেওয়া হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা নয়। বা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উপর আমাদের মতামত চাপিয়ে দেওয়া । (হকীকত নিউজ www.haqiquatnews.com) একটি নিউজ পোর্টাল যারা সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন।





