পশ্চিম বঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীদের তুলনায় তৃণমূল কংগ্রেস অনেক কদম এগিয়ে কিন্তু কেন ? – একটি গ্রাউন্ড রিপোর্ট
নন্দ দুলাল ভট্টাচার্য, হাকিকত নিউজ, গ্রাম বাংলা : গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি রাজনৈতিক দল বা তার কর্মীরা কী ভাবছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সাধারণ মানুষ এবং বৃহত্তর সমাজ কী ভাবছে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ । পঞ্চায়েত নির্বাচন শাসক ও বিরোধী দুপক্ষের কাছেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিরোধীদের জন্য পঞ্চায়েত নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শাসক দলের দাপট রুখে যদি পঞ্চায়েতে ভাল ফল করা যায়, তাহলে লোকসভা নির্বাচনের আগে দলীয় কর্মীদের অনেকখানি আত্মবিশ্বাসী করে তোলা যাবে। বিরোধী রাজনৈতিক দল গুলোর শুধু দুর্নীতি-দুর্নীতি রব দিয়ে এই দুর্নীতির ইস্যুতেই গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচন বৈতরণী পার করা বোধহয় সম্ভব নয়। নারদা সারদা চিটফান্ড, চাকরি দুর্নীতি তো কম দিন হল না বেশ কিছু মানুষ এই দূর্নীতি তত্ত্বে বিশ্বাস করছে আবার বেশ কিছু মানুষ এই বিষয় টাকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেননা। গ্রাম পঞ্চায়েতের ভোট স্থানীয় ইস্যু যেমন গ্রামীণ অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, জল সরবরাহ ইত্যাদির মতো উন্নয়ন যা গ্রামবাসীদের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে সে নিয়েই বেশি প্রভাবিত হয়। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস অনেক কদম এগিয়ে, তাঁরা সরকারি প্রকল্প কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, এবং অন্যান্য যা গ্রামীণ জনগণকে উপকৃত করেছে এবং এক বিরাট সংখ্যক সরাসরি সুবিধাভোগী তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন। অফিসিয়াল বিরোধী দল বিজেপির অবস্থান এক কথায় বলতে গেলে খুব একটা আশাপ্রদ নয়।বুথ স্তরে সাধারণ মানুষদের মধ্যে সাড়া জাগানোর মতো কোনও কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেনি গেরুয়া শিবির। উত্তরবঙ্গের কিছু জেলা ছাড়া অন্য জেলা গুলোতে গেরুয়া শিবিরের জন্য ছবিটা খুব একটা আশাপ্রদ নয়। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব বেশ কিছু কর্মসূচি নিয়েছেন বটে কিন্তু সামগ্রিক ভাবে গ্রামীণ এলাকায় বুথ স্তরে এর কোনো প্রভাব খুব একটা চোখে পড়লোনা । অন্যদিকে সিপিআই (এম) কিছুটা হলেও মাঠে ময়দানে কাজ করছে।পঞ্চায়েত নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে গ্রামে -গ্রামে জনসংযোগ করছে । দলীয় সংগঠনের নড়াচড়াও আগের তুলনায় অনেকটা বেড়েছে। সম্প্রতি রাজ্যজুড়ে গ্রাম জাগাও কর্মসূচি নিয়েছিল সিপিআই (এম)। কিছু কিছু জেলায় আগের তুলনায় অনেক বেশি বুথ লেভেলে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন বামপন্থীরা। জমায়েতে কিছু লোকজন হচ্ছে বটে কিন্তু গ্রামের বা পাড়ার মিছিলে সেরকম লোকজন চোখে পড়ছেনা। প্রদেশ কংগ্রেস কিছু সীমিত গন্ডির মধ্যে ঘোরা ফেরা করছে এবং তাদের গতিবিধি মূলত কিছু জেলায় মধ্যে সীমাবদ্ধ। পঞ্চায়েত নির্বাচনেও তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি কে মোকাবিলা করা কংগ্রেসের পক্ষে কঠিন। অনেক জেলায় আমরা সাধারণ মানুষের সাথে আলাপকালে দেখেছি কংগ্রেসের পক্ষে সমর্থন রয়েছে কিন্তু দলটির প্রধান সমস্যা হচ্ছে গ্রাউন্ড লেভেলে নেতৃত্বের অভাব যার ফলে একটি সাংগঠনিক শূন্যতা তৈরী হয়েছে এবং এই শূন্যতার প্রতিফলন ভোট বাক্সেও দেখা দেয় । এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোট কত খানি প্রাসঙ্গিক এবং কার্যকরী হবে সেটা একটা বড়ো প্রশ্ন চিহ্ন থেকে যাচ্ছে বইকি। বিগত বিধান সভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে এই জোট নিজেদের তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে এই কথা টা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবেনা যে নির্বাচন কোনও পাটিগণিতের নিয়ম মেনে চলেনা এটা অঙ্ক নয়, রসায়ন ( আবেগ, অনুভূতি, ভালবাসা, গ্রহণযোগ্যতা,বিশ্বাসযোগ্যতা) জড়িয়ে আছে । দুটো দলের নেতৃত্ব কি সিদ্ধান্ত নিলো তারথেকেও প্রাসঙ্গিক হচ্ছে দুটো দলের তৃণমূল স্তরের রাজনৈতিক কর্মী এবং সমর্থকরা কি ভাবছেন সাধারণ ভোটার নেতা, মন্ত্রী নয় স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের উপরে বেশী ভরসা রাখেন। বাম-কংগ্রেসের জোট এই রাজ্যে কংগ্রেসের কাছে বামপন্থীদের আত্মসমর্পণের উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে কোনও আদর্শগত কারণে নয়। এইবার তিন ‘বড় বিরোধী দল গুলো ছাড়াও একটা চতুর্থ বিরোধী দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF) এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে লড়ছে অবশ্য তাদের শক্তি দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হুগলী, উত্তর ২৪ পরগনা, মালদা ও মুর্শিদাবাদের কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ। এই পঞ্চায়েত নির্বাচন টা ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের কাছেও একটা লিটমাস টেস্ট। কাজেই গ্রামবাংলার মাটির দিকে নজর রাখলে বলাই যায় আপাতত প্রাধান্য তৃণমূল কংগ্রেসের । আমরা আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সাধারণ গ্রামবাসী, ছোট কুটির শিল্পের মালিক,স্থানীয় দোকানদার, কৃষি দ্রব্য বিক্রেতা, শিক্ষিত গ্রামের যুবকদের সাথে আমাদের ব্যক্তিগত কথোপকথনের মাধ্যম জানার চেষ্টা করেছি এই আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে তারা কী প্রত্যাশা করছেন এবং বিভিন্ন স্তরের গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিক্রিয়া রেখেছেন। সেই ভিত্তিতে একটি বাস্তব প্রতিবেদন তৈরি করার চেষ্টা করেছি । গ্রামবাংলার বড়ো অংশের মানুষ তাদের প্রতিক্রিয়া বলেছেন যে অতীতের বামফ্রন্ট শাসনের কথা বিবেচনা করে বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেস সরকার কাঠামোগত কাজ – রাস্তা,পানীয় জলের সুবিধা, রাস্তার আলো ইত্যাদির ক্ষেত্রে আগের তুলনায় ভাল কাজ করেছেন এবং তৃণমূল সরকারের জনকল্যান মূলক কর্মসূচি – স্বাস্থ্য সাথী, কন্যাশ্রী, শিক্ষাশ্রী, যুবশ্রী, নিজ গৃহ নিজ ভূমি, কর্মশ্রী ইত্যাদি নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও কিন্তু শিক্ষিত বেকার যুবকদের প্রতিক্রিয়া বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর প্রতি খুব একটা আশানুরূপ ছিলোনা ? এবার একটু মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাক গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা এবং সামাজিক প্রকৌশলী (social engineering) এখনো বিরোধী রাজনীতিক দল গুলোরে থেকে অনেক অংশে বেশী রয়েছে। আমরা স্থল বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছি, গ্রাম পঞ্চায়েত শাসনের জন্য কাকে নির্বাচন করবেন তা সাধারণ মানুষই সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এই বাংলার গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফল অবশ্যই আসন্ন ২০২৪ (2024) লোকসভা নির্বাচনের জন্য একটি বৃহত্তর চিত্র পেশ করবে ।
উপসংহার : বিরোধী রাজনৈতিক দল গুলোর শুধু দুর্নীতি-দুর্নীতি রব দিয়ে আর শুধু দুর্নীতির ইসু নির্ভর করে পশ্চিম বঙ্গের গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচন বৈতরণী পার করা বোধহয় সম্ভব নয়। চটুল কিছু বক্তিতা দিয়ে দলীয় সমর্থক দের হাততালি কুড়োনো যায় সাধারণ মানুষের ভোট নয়। এটা সর্বজনবিধিত যে আজকের রাজনৈতিক পরিবেশে কোনও রাজনৈতিক দলই ধোয়া তুলসী পাতা নন ।গ্রাম পঞ্চায়েতের ভোট স্থানীয় ইস্যু যেমন গ্রামীণ অবকাঠামো, কর্মসংস্থান (শিক্ষিত গ্রামীণ যুবক-যুবতীদের বেকারত্বের বিষয়ে), শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, জল সরবরাহ ইত্যাদির মতো উন্নয়ন যা গ্রামবাসীদের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে সে নিয়েই বেশি প্রভাবিত হয়। শুধু কথার জগলারি নয় বিরোধী রাজনৈতিক দল গুলোর একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দিতে হবে। সময়ের প্রয়োজনে দরকার একটি সঠিক কর্মসংস্থান নীতি- পশ্চিমবঙ্গ দক্ষ এবং অদক্ষ উভয় কাজের ক্ষেত্রে একটি নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন আছে বইকি। শিক্ষিত গ্রামবাংলার যুবক, যুবতীদের জন্য একটি সঠিক কর্মসংস্থান নীতি প্রস্তুত করতে হবে, যার লক্ষ্য বেকার যুবক যুবতীদের গুরুত্বপূর্ণভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। পঞ্চায়েত ভোটে দল বা রং বিষয় নয়। আসল বিষয় হল এলাকার উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধান।
সংবিধিবদ্ধ ঘোষণা : একটি নিরপেক্ষ নিউজ পোর্টাল হিসেবে উপলব্ধ তথ্য ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই সংবাদে বক্তব্য ও মন্তব্য দেওয়া হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা নয়। বা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উপর আমাদের মতামত চাপিয়ে দেওয়া । (হকীকত নিউজ www.haqiquatnews.com) একটি নিউজ পোর্টাল যারা সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন।
পুনশ্চ :আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা মানে নিছক শাসক শ্রেণীর কিছু দিক তুলে ধরে কিছু চটুল কটূক্তি করে চটজলদি জনপ্রিয়তা অর্জন করা নয়। মূল বিষয়বস্তুর বাস্তব দিক জনসমক্ষের সামনে নিয়ে আসা। আমরা শুধু আঙ্গুল তুলে আর ষ্টুডিওর মধ্যে বসে বক্তিতা না দিয়ে গ্রাউন্ড জিরো থেকে গ্রাউন্ড রিয়ালিটি তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমরা দুর্নীতি কে কোনো রকম সমর্থন না জানিয়ে এই কথা বলছি যে দুর্নীতি এখন ভারতের গণতন্ত্রে সবচে বড়ো বিপদ। বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রেই কম বেশী প্রশাসনিক দুর্নীতি চলে। ভারত কোনো ব্যতিক্রম নয়। এটি একটি সামাজিক রোগ। কিন্তু এই দুর্নীতির রোগ টা একটা মহামারীর আকার ধারণ করলে সব থেকে বেশি ধাক্কা খাবে গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ।





