পশ্চিম বঙ্গের উন্নয়নে দরকার একটি পজেটিভ এপ্রোচ তবেই বন্ধ করা যাবে মেধা প্রবাহ বা ব্রেনড্রেন ?
নন্দ দুলাল ভট্টাচার্য, হাকিকত নিউজ, কোলকাতা : মেধা প্রবাহ বা ব্রেনড্রেন বর্তমান আধুনিক বিশ্বে খুব প্রচলিত একটি শব্দ। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ থেকে এই ধরণের প্রবাসন হয়ে থাকে, মুলত উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশ গুলি থেকে মেধা প্রবাহের পরিমান সব থেকে বেশি। আমাদের পশ্চিম বঙ্গ থেকে এই মেধা প্রবাহ বা ব্রেনড্রেন আজও অব্যাহত । ব্রেন ড্রেনের কারণে রাজ্য আরও উন্নতির সক্ষমতা হারাতে বসে। প্রতিভাবান ছেলে মেয়েরা রাজ্যে জন্মগ্রহণ করে, বেড়ে ওঠে এবং শিক্ষিত হয়; কিন্তু যখন উচ্চ শিক্ষা বা কাজ করার সময় আসে, তখন তারা রাজ্য বা দেশ ছেড়ে চলে যান উন্নত রাজ্য বা দেশে চাকরির খোঁজে। প্রশ্ন হলো, কেন উচ্চশিক্ষিত এবং সবচেয়ে বুদ্ধিমান ছেলে মেয়েরা রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র যেতে পছন্দ করছেন ? কারণ গুলো কে গভীর ভাবে বিশ্লেষেণের প্রয়োজন আছে বইকি। আমাদের নীতি নির্ধারকদের খুব গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে অন্যথায় আমাদের রাজ্যকে দীর্ঘমেয়াদে খুব ভারী মূল্য দিতে হবে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের এটি অনুধাবন করতে হবে যে, অর্থনীতির ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে রাজ্যের অগ্রগতি, রাজ্যের সমস্ত সম্পদ, যার মধ্যে শিক্ষিত কর্মীও অন্তর্ভুক্ত। এই ভারসাম্য ছাড়া একটি অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।ব্রেন ড্রেনের কারণে রাজ্য এবং দেশ, শিল্প সংস্থাগুলো মেধাবী ব্যক্তিদের একটি মূল অংশকে হারায়। ব্রেন ড্রেনের ফলে তাৎক্ষণিক ক্ষতিকারক ফলাফল দেখা যায় না; বরং দীর্ঘ মেয়াদে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা দেয়। আমাদের বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতামূলক থাকার জন্য আরও সক্রিয়ভাবে উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের ধরে রাখতে কাজ করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, যদি রাজ্যের সেরা মেধাবী ডাক্তার, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার ,গবেষকরা , অন্যত্র চলে যান, তাহলে নতুন ডাক্তারী পড়ুয়াদের ,বা ছাত্রদের পক্ষে সেরা শিক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং পুরো রাজ্যটাই একটা নিম্নগামি মেধায় পরিবর্তিত হয়ে যাবে, যার খারাপ প্রভাব সমাজের প্রতিটি মৌলিক চাহিদায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা,অবকাঠামো উন্নয়নের উপরে পড়বে। আমাদের রাজ্যে বর্তমানে যে উন্নয়নের গতিতে রয়েছে, তাকে ধরে রাখতে এবং আরও এগিয়ে নিতে আমাদের নীতিনির্ধারকদের শীগ্রই ব্রেন ড্রেন থেকে ব্রেন গেইন নীতিতে যেতে হবে। একসময় বাংলা শিল্প ,অর্থনীতি থেকে সংস্কৃতি সবেতেই ছিল শিখরে । আজ বাংলা যেরকম পিছিয়ে পড়েছে, তেমনই অস্তমিত কলকাতার গৌরব। পুনে, ব্যাঙ্গালোরের থেকে কলকাতার যানবাহন ব্যবস্থা অনেক গুন ভালো। আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে আমাদের বাংলা খুব ভালো অবস্থানেই দাঁড়িয়ে আছে।ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির মধ্যে কলকাতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং পূর্ব ভারতে কলকাতাই একমাত্র শহর যেখানে শিল্প উপযোগী সমস্তরকম পরিকাঠামো রয়েছে। শিক্ষা হোক বা চিকিৎসা ব্যবস্থা, কলকাতাই সবচেয়ে বড় ভরসা পূর্ব ভারতের লোকজনের কাছে। সর্বোপরি শিল্পসংস্কৃতিতে কলকাতা এখনও অনেক এগিয়ে। এত কিছুর পরেও কলকাতা বা বাংলার পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ, শিল্পে বিনিয়োগ আনতে না-পারা।গত দশ বছরে শিল্প সম্মেলনের মঞ্চে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা লগ্নির প্রস্তাব এলেও সেই অনুপাতে শিল্পায়ন হয়নি এই রাজ্যে। কারণ শুধুমাত্র লগ্নি আনলেই হয় না, সরকারকে শিল্পস্থাপনের জন্য অনুকূল পরিবেশও তৈরি করে দিতে হয়। এর মধ্যে রাস্তাঘাট, বিদ্যুতের মতো পরিকাঠামোর কাজ যেমন পড়ে, তেমনই চাই লগ্নিকারীদের প্রতি একটি সদিচ্ছা। এই রাজ্যের শ্রমমূল্য খুবই কম। ভিন্ রাজ্যে একই কাজের জন্য যে বেতন পাওয়া যায়, এ রাজ্যে তার অর্ধেক মেলে।অর্থাৎ শুধু শিল্পে বিনিয়োগ আনলেই হবে না, তার সঙ্গে চাই একটা পসিটিভ এপ্রোচ। শিল্পের অনুকূল পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, শ্রমের যথাযথ মূল্য যাতে মেলে সেদিকে নজর দিতে হবে। শিল্পায়নের জন্য যেমন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার দরকার, তেমনই কলকাতার উন্নয়নেও নির্দিষ্ট রূপরেখা দরকার তবেই তিলোত্তমা কলকাতাই এনে দেবে বাংলার ‘আসল পরিবর্তন।





