দুর্গা পূজা সম্পর্কে একটি বা দুটি নয় সাতটি আকর্ষণীয় তথ্য
নন্দ দুলাল ভট্টাচার্য, হাকিকত নিউজ, কোলকাতা : বছরের নতুন ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা হাতে পেলেই বাঙালিরা যে দিনগুলিতে সবার আগে চোখ বোলায়, তার মধ্যে দুর্গা পুজো একটি। উৎসবপ্রেমী বাঙালির সবচেয়ে বড়ো পার্বন এই দূর্গা পূজা। বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয়, এবং জমকালো উৎসবের সাথে কিছু তথ্য জড়িত আছে ? মন্ত্রমুগ্ধ প্যান্ডেল, নতুন জামাকাপড়, হাসি আর শুভেচ্ছা জানিয়ে দুর্গাকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, এমনকি গোটা বিশ্বের বাঙালিরা। সারা বছর ধরে আমরা আগ্রহে বসে থাকি এই দুর্গোউৎসবের দিন গুলোর জন্য। বাংলার সবচেয়ে প্রতীক্ষিত উৎসব দুর্গাপূজা সম্পর্কে আমরা সাতটি আকর্ষণীয় তথ্য তুলে ধরছি :–
১. এটা আসল দুর্গাপূজা নয় :- আমরা অক্টোবর মাসে যে দুর্গাপূজা উদযাপন করি তা প্রকৃত দুর্গাপূজা নয়। এটি অকাল বোধন নামে পরিচিত, রাবণ বধের পূর্বে ভগবান রাম দেবী পার্বতীর কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে বিল্ববৃক্ষতলে বোধনপূর্বক দুর্গাপূজা করেছিলেন। শরৎকাল দেবপূজার ‘শুদ্ধ সময় নয় বলে রাম কর্তৃক দেবী পার্বতীর বোধন ‘অকালবোধন নামে পরিচিত হয়। প্রকৃত দুর্গা পূজা মার্চ মাসে উদযাপিত হয় এবং রাম নবমীর ঠিক আগে চৈত্র বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত।
২. উমার আগমন এবং গমন বাহনের উপর নির্ভর করে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং সুখের বিষয় :- হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, দেবীর দুর্গার মর্তে আগমন ও গমন যে বাহনে, তার ওপর নির্ভর করে গোটা বছরটা পৃথিবীবাসীর কেমন কাটবে। দেবী দুর্গার মোট চারটি বাহন আছে, যাঁদের উপর চড়ে তিনি মর্ত্যে আসেন বা ফেরত যান যথা, ঘোড়া, দোলা (পালকি) নৌকা এবং হাতি। এর মধ্যে নৌকা এবং হাতিতে যদি দেবীর আগমন ঘটে তাহলে সেটা শুভ বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে ঘোড়া, এবং দোলাকে (পালকি) অশুভ বলে মনে করা হয়ে থাকে। ঘোড়া ফসলের ধ্বংস আনে, নৌকা বন্যা আনে এবং দোলা (পালকি) পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয়। বিশ্বাস করুন বা না করুন, এর পরিণতি অনেকাংশে সত্য হয়। এই বছর (২০২২) দেবী দুর্গার আগমন হাতিতে (গজে) যার অর্থ শস্যপূর্ণ হবে এই বসুন্ধরা। দেবী কৈলাসে ফিরবেন নৌকায় যার অর্থ শস্য বৃদ্ধি ও জল বৃদ্ধি।
৩. একমাত্র উৎসব যেখানে পুরোহিত কে ভিক্ষা করতে হয় :- কাদামাটি বা পুণ্যমাটি হুগলি নদীর তীর থেকে সংগ্রহ করা হয়। যে পুরোহিত প্রথম আচার পালন করেন তাকে অবশ্যই নিষিদ্ধ এলাকায় যেতে হবে। প্রথম মাটি পতিতালয় থেকে সংগ্রহ করতে হবে এবং এটির জন্য পুরোহিতকেই ভিক্ষা করতে হবে। কারণ হল দেবী তার সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করেন না। পতিতালয়ের মাটি অত্যন্ত বিশুদ্ধ বলে মনে করা হয়।
৪. চক্ষুদানের আচার বা মাকে তার চোখ দেওয়া অন্ধকারে করতে হবে : আমরা সবাই জানি যে মহালয়া দুর্গাপূজার সূচনা করে বরং চক্ষুদানের আচার দুর্গাপূজার শুরুকে চিহ্নিত করে। এটি একটি প্রাচীন রীতি যে চক্ষু দানকারী পুরোহিতকে অবশ্যই পরম অন্ধকারে চক্ষুদানের আচার সারতে হবে। দুর্গাপুজোয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আচার হল চক্ষুদান। শুদ্ধাচারে ডান হাতে কুশের অগ্রভাগ নিয়ে দেবীকে কাজল পরানো হয়। প্রথমে ত্রিনয়ন বা ঊর্ধ্বনয়ন, তারপর বাম চক্ষু এবং শেষে ডান চক্ষু অঙ্কন করা হয়। প্রতিটি চোখ অঙ্কনের সময় রীতি মেনে মন্ত্র বলতে হয়। ত্রিনয়ন-বাম-ডান প্রতিটি চোখ অঙ্কনের জন্যই আলাদা আলাদা মন্ত্র রয়েছে। এই চক্ষুদান পর্বের পর প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী রূপে প্রতিষ্ঠিত হন দেবী। প্রাণ প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র দেবী দুর্গারই করা হয়, তা কিন্তু নয়। প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয় লক্ষ্মী, গণেশ, সরস্বতী, কার্তিক এবং তাঁদের বাহনদেরও। এমনকী বাদ যায় না অসুরও। প্রত্যেকের জন্যই রয়েছে আলাদা আলাদা মন্ত্র এবং উপাচার।
৫. ডাকের সাজের সরঞ্জাম জার্মানি থেকে আমদানি করা হতো : শোলার শাজ সম্পূর্ণ ঐতিহ্যবাহী এবং ভারতীয় কর্ক দিয়ে করা হতো। ধনী জমিদার পারিবাররা সামনে এসে শোলার সাজের পরিবর্তে রূপোর ফয়েলে দেবীকে আবৃত করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই রুপোর ফয়েল দিয়ে শুরু হলো ডাকের সাজ এবং সেটি জার্মানি থেকে আমদানি করা হতো। এবং শুরু হলো দেবী দুর্গাকে ডাকের শাজে সাজানোর নতুন শৈলী ।
৬. প্রথম দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছিল দিনাজপুরে :- প্রথম দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছিল কলকাতায় নয় এটি ১৬ শতকের দিকে উদযাপিত হয়েছিল মালদহ, দিনাজপুরের রাজপরিবার দ্বারা যারা প্রথম মায়ের পূজার প্রথা শুরু করেছিলেন। ১৭৯০ (1790) সালের দিকে হুগলিতে প্রথম বারোয়ারি পূজা বা বারো বন্ধু পুজো শুরু হয়েছিল। কলকাতায় দুর্গো পুজো ১৯০৯ ( 1909) সাল নাগাদ শুরু হয়।
৭. . দেবী দুর্গার সাথে একটি অতিরিক্ত সদস্য রয়েছে :- দেবী দুর্গার সাথে কে আসে? আপনি সহজেই গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং শিবকে পিছনে দেখতে পারেন। তবে আরও একজন সদস্য উপস্থিত রয়েছেন। কলা বউ আসলে ভগবান গণেশের স্ত্রী, ঋদ্ধি-সিদ্ধি। তিনি কলার কাণ্ডের মতো শোভা পাচ্ছেন, কাপড়ে মোড়ানো, স্নান করা এবং এমনকি পূজা করা হয় ।
দুর্গা মায়ের আগমনের বাণী ঘোষণা করেই যেনো প্রকৃতি সেজে ওঠে এক অভিনব সজ্জায়। কোন এক প্রাচীন যুগে হয়ত এমনই মনোরম পরিবেশে সকল বিপত্তির অবসানের উদ্দেশ্যে শরৎকালে দেবী দুর্গার অকালবোধনের আয়োজন করেছিলেন ভগবান রামচন্দ্র। ধনী বা দরিদ্র- সকল প্রকার ভেদাভেদ দূরে সরিয়ে সবাই মিলেমিশে পরম আনন্দে আমরা এই উৎসবে মেতে উঠি। তাই জাত-পাত, ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে সবাই এতে বাঁধা পড়ে প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনে। আর এখানেই বাঙালির দুর্গোউৎসবের সার্থকতা।





