গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয় মানুষই শেষ কথা বলে

Spread the love

নন্দ দুলাল ভট্টাচার্য,হাকিকত নিউজ,কোলকাতা : গণতন্ত্রে একজন রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক দল কী ভাবছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং যে কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষ কী ধারণা পোষণ করছেন তা গুরুত্বপূর্ণ।সম্প্রতি বেশ কিছু উচ্চ-প্রোফাইল রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনৈতিক আচরণ জনসমক্ষে এসেছে কিন্তু এই ঘটনাগুলি কতখানি  মানুষের মনে রেখা পাত করেছে এবং আগামী নির্বাচনে এই ঘটনাগুলি কি ভোট বাক্সে কোনো প্রতিফলন ঘটাবে? আমরা  শহরতলি এবং বিভিন্ন জেলার সাধারণ মানুষদের সাথে কথোপকথনে বেশ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। একটা কথা আছে না “ট্রুথ ইস স্ট্রেঞ্জার দেন ফিক্শন” (Truth is stranger than fiction) এই ঘটনার পরিপেক্ষিতে প্রচুর লোক বিশেষ করে সুদূর জেলার গ্রাম বাংলার লোকজন নিজেদের বিভিন্ন মতামত রেখেছেন। আমরা এই ব্যক্তিগত কথোপকথন থেকে বেরিয়ে আসা বাস্তবিক উপলব্ধি তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এই সাম্প্রতিক অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা একজন রাজনীতিবিদকে প্রভাবিত করেনি বরংপুরো রাজনীতিবিদদের প্রতি গভীর আস্থার ঘাটতি তৈরি করেছে। কারণ হিসেবে যেই ব্যাখ্যা টি সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে উঠে এসেছে তা হলো স্বাধীনতার পর থেকে আজ অব্দি রাজনৈতিক নেতা বা তার কাছের বা দলের লোকরা প্রিভিলেজড ক্লাস( Privileged class) হিসেবে  গণ্য হয়ে এসেছে আর সাধারণ মানুষ তো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ভোট বাক্সের সংখ্যা মাত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। আর সাম্প্রতিক ঘটনা গুলি কে সাধারণ মানুষ আলাদা করে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাননি “বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন সময়ের কর্মপন্থার ব্যাখ্যা দিয়েছেন তারা”। কিন্তু একটা সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এটি একবারে কাম্য নয়। রাজনীতি ও সুশীল সমাজের মধ্যে একটি সিম্বায়োটিক( symbiotic) সম্পর্ক রয়েছে এবং একে  অপরের পরিপূরক, কিন্তু একে অপরের আস্থার উপরে যদি প্রতিনিয়ত কুঠারাঘাত হতে থাকে তাহলে এর দূরগামী পরিনাম গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষে খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। কিন্তু এই বিশ্বাসের জায়গায় সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি, ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে তাদের এই ভদ্রতার মুখোশে খসে পড়ে এবং তাদের আসল চেহারাটা জনসমক্ষে চলে আসে। দেখা যায়, এত দিন যিনি একজন সম্মানীয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে তার কদাকার মুখ। তখন তাকে চিনতে কারো কষ্ট হয় না। কেননা, একই সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে তার কৃতকর্মের ইতিহাস। সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে এদের অবস্থান লক্ষ করা যায়। এরা হতে পারে প্রশাসনের বড় কোনো কর্তা, রাজনৈতিক নেতা কিংবা নানা স্তরের জনপ্রতিনিধিও। এদের কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রে সৃষ্টি হয়েছে ভয়ংকর ধরনের অবক্ষয়ের ধারা। এরা সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থান করে ভেতর থেকে ভঙ্গুর করে দিচ্ছে সমাজকে, রাষ্ট্রকে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনীতিতে এসব দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষদের জায়গা করে নেওয়া। প্রশ্ন হলো, রাজনীতির অভ্যন্তরে ( দল মত নির্বিশেষে )এসব ক্ষতিকর মানুষরা ঠাঁই করে নিতে পেরেছে কীভাবে? উত্তর একটাই, রাজনীতির মানুষদের একটি অংশের আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক মানসিকতার কারণেই এরা বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। আর সে বাড় এতটাই বেড়েছে যে, তা গোটা রাজনীতিকেই গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। আগে রাজনীতিতে কদর ছিল সেই ছেলে বা মেয়েটির, যে লেখাপড়া জানে, রাজনীতি বোঝে, সমাজে ভালো হিসেবে যার পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু এখন চিত্র একেবারে বিপরীত। নীতি-আদর্শের পরিবর্তে শক্তি দিয়ে রাজনীতির মাঠ দখলের অশুভ প্রবণতা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে গ্রাস করায় এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এর ফলে আমাদের রাজনীতির ময়দান অনেকটাই চলে গেছে নষ্টদের দখলে। শক্তি দিয়ে রাজনীতির মাঠ দখলের এই অশুভ প্রবণতায় কম বেশী “সব রাজনৈতিক দল” ভুগছেন। আজকের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কোনও রাজনৈতিক দল ধোয়া তুলসী পাতা নন। গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রাজনৈতিক ক্ষমতার বিপরীতভাবে সমানুপাতিক (democracy & democratic values are Inversely proportional to political power) যার ফলে রাজনৈতিক দলের যে যেখানে ক্ষমতায় রয়েছে সে সেখানে অযৌক্তিককে যৌক্তিক করার চেষ্টা করছে। আজকের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তো ফুটবল- ক্লাবে  জার্সি বদল এর মতো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা দলবদল করছেন, সকালে এক রং তো বিকেলে আরেক রঙ্গের জার্সি । এই সব নেতা-কর্মীরা অঙ্ক কষে কোন দলে গেলে কত লাভ। কার পালে হাওয়া বেশি? কোথায় গেলে রাজনৈতিক কেরিয়ার সুরক্ষিত হবে? ব্যক্তিগত লাভ, সুবিধাবাদী রাজনীতি, কোনও আদর্শের টানে তারা দলবদল করেন না। এই সব নেতারা সুযোগসন্ধানী রাজনীতির মধ্যে দিয়ে,ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষে জনগণের আস্থা-বিশ্বাসকে ক্রমাগত কুঠারাঘাত করে চলেছেন। আবার রাজনৈতিক দলগুলি চটজলদি ক্ষমতা দখলের জন্য এদের মদত দিয়ে চলেছে।এর ফলে রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক নেতাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে এবং এ কারণে এই রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থাপিত গুরুতর বিষয়গুলোও সাধারণ মানুষ গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না। আর ভালো মানুষেরা “এ কর্ম আমার নয়” বলে সরে পড়ছে। অথচ, রাজনীতিতে তাদেরই থাকার কথা, যারা এর মূল চেতনাকে লালন করবে, নীতি-আদর্শের প্রতি থাকবে অবিচল। কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রই দৃশ্যমান আমাদের সামনে। এসব দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা ওপরওয়ালাদের স্লেহ-আশীর্বাদে কখনো কখনো এতটাই শক্তিধর হয়ে ওঠে যে, আইন ও প্রশাসন তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে সাহস পায় না। বরং উঠতে-বসতে তাদের সালাম ঠুকে।আমাদের রাজনীতি যে বর্তমানে দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষদের আক্রমণে পর্যুদস্ত তা অস্বীকার করা যাবে না। চিন্তার বিষয় হলো, এ আক্রমণে শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক কাঠামো বিপর্যস্ত এবং ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। কারণ, রাজনীতির অঙ্গনে এসব মানুষদের দৌরাত্ম্য এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছে যে, ভালো মানুষেরা এখন আর সেখানে স্বস্তিবোধ করেন না। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, দু-একজন রাঘব বোয়াল জালবন্দি হওয়া মানেই নীতিভ্রষ্ট মানুষদের নির্বংশ হওয়া নয়। রাজনীতির মানুষেরা যদি সতর্ক না হন, তাহলে নতুন করে আরো দুর্নীতিগ্রস্থের জন্ম হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদের জন্ম ও বিস্তার প্রতিরোধ করা। আর এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকায় থাকতে হবে রাজনীতিবিদদের। দেশ ও জনগণের সর্বাধিক কল্যাণ এবং চূড়ান্ত অনিষ্ট করার সামর্থ্য বা ক্ষমতা রয়েছে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের।কোনো দেশের রাজনীতি যদি হয় নীতিহীন, পচনগ্রস্ত; তবে সে দেশটির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও সেই সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। একইভাবে, কিছু কিছু সীমাবদ্ধতার পরও, রাষ্ট্র পরিচালনব্যবস্থা হিসেবে পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। কিংবা হয়তো আছে, অধিকতর ও কার্যকর গনতন্ত্র। দায়িত্বশীলতা যার প্রধান ও অপরিহার্য শর্ত। সমস্যার মূলে না গিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা না করে, কিংবা মূল ইস্যু থেকে চোখ ফিরিয়ে বা তাকে পাশ কাটিয়ে, এভাবে একে অপরকে দোষারোপ করার, পাল্টাপাল্টির যে ভয়ংকর রাজনৈতিক সংস্কৃতি আজ দেশে গড়ে উঠেছে, তা দেশকে প্রকৃতই ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে । সরকার কিংবা বিরোধী দল যে অবস্থানেই থাকুন, আমাদের রাজনৈতিক নেতারাও যে কখনো কিছু দোষ করতে পারেন, তাঁদেরও যে কমবেশি ভুল হতে পারে, এটা তাঁরা মনে হয় বিশ্বাস করেন না। ফলে দোষ বা ভুল স্বীকারের, আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি এ দেশে আজও গড়ে ওঠেনি। কিন্তু ইতিহাস বড় রসিক পুরুষ একটি প্রবাদ আছে হিস্ট্রি রিপিট ইটসেলফ (ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে) কাউকে ক্ষমা করে না। বহু শতাব্দী আগে হেমলক ভর্তি কাপে নিশ্চিন্তে চুমুক দিতে দিতে সক্রেটিস বলে গেছেন , “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞানীরা জ্ঞানী হবার কারণে অনুশোচনা করবে, মুর্খরা তাদের মুর্খতার জন্য গর্ব করবে, আর দুর্নীতিবাজেরা তাদের দুর্নীতির জন্য উল্লাস করবে!” সেই সক্রেটিস থেকে শুরু হওয়া রাজনীতির নির্লজ্জতার ধারাবাহিক ইতিহাস হয়তো আজও বয়ে চলেছে। কিন্তু ইতিহাস এটাও শিখিয়েছে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা কোনো দিনও চিরস্থায়ী নয়। গণতন্ত্রে মানুষই শেষ কথা বলে।

সংবিধিবদ্ধ ঘোষণা : এই সংবাদে দেওয়া মন্তব্যগুলি একটি নিরপেক্ষ নিউজ পোর্টাল হিসেবে  উপলব্ধ তথ্য এবং পর্যালোচনাগুলির উপর ভিত্তি করে। আমাদের উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। কিংবা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উপর আমাদের মতামত চাপিয়ে দেওয়া। (হাকিকত নিউজ www.haqiquatnews.com) একটি সম্পূর্ণ সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রতি সচেতন নিউজ পোর্টাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Warning: Undefined array key "posts_per_page" in /home/ogabacvy/domains/bengali.haqiquatnews.com/public_html/wp-content/plugins/youtube-showcase/includes/class-emd-widget.php on line 284

Warning: Undefined array key "has_pages" in /home/ogabacvy/domains/bengali.haqiquatnews.com/public_html/wp-content/plugins/youtube-showcase/includes/class-emd-widget.php on line 287

Warning: Undefined array key "has_pages" in /home/ogabacvy/domains/bengali.haqiquatnews.com/public_html/wp-content/plugins/youtube-showcase/includes/class-emd-widget.php on line 287

Warning: Undefined array key "has_pages" in /home/ogabacvy/domains/bengali.haqiquatnews.com/public_html/wp-content/plugins/youtube-showcase/includes/class-emd-widget.php on line 287

Warning: Undefined array key "has_pages" in /home/ogabacvy/domains/bengali.haqiquatnews.com/public_html/wp-content/plugins/youtube-showcase/includes/class-emd-widget.php on line 287

Warning: Undefined array key "has_pages" in /home/ogabacvy/domains/bengali.haqiquatnews.com/public_html/wp-content/plugins/youtube-showcase/includes/class-emd-widget.php on line 287

Warning: Undefined array key "has_pages" in /home/ogabacvy/domains/bengali.haqiquatnews.com/public_html/wp-content/plugins/youtube-showcase/includes/class-emd-widget.php on line 301
Search Videos